কুমিল্লায় অবৈধ ইটভাটার ছড়াছড়ি

কুমিল্লায় অপরিকল্পিতভাবে যেখানে সেখানে আবাদি জমির ওপর গড়ে উঠেছে বৈধ-অবৈধ ‘ইটখোলা’ বা ‘ইটভাটা’। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। জেলায় অনুমোদিত ২৯৭টি ইটভাটার মধ্যে ১২৭টির নবায়ন নেই এবং ৩৯টিতে কার্যক্রম চলছে ছাড়পত্র ছাড়াই।

লোকালয় তথা মানুষের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও গ্রামগঞ্জের অতি সন্নিকটে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক ইটের ভাটা। এছাড়া ইট প্রস্তুতে ভাটাগুলোয় এলাকার কৃষকের জমির উপরিভাগের মাটি কিনে ব্যবহার করায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অপরিকল্পিত ইটভাটার কারণে কমে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। এতে প্রতিনিয়ত ভাটার ধোঁয়ার দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি ফলফলাদি, গাছগাছালির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং পরিবেশ হারাচ্ছে বৈচিত্র্য ও বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও অনেকটা নির্লিপ্ত। জেলার কয়েকটি এলাকায় ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক ইটের ভাটা রয়েছে। অর্ধেকেরও বেশি ভাটার নবায়ন নেই। অনেকগুলো ভাটার নেই বিএসটিআই সনদ, কৃষি ও পরিবেশ ছাড়পত্র। অনেকে আবেদন দাখিল করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া অনেকেই মানছেন না ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ও শর্তাবলি। সূত্র জানায়, পরিবেশ দূষণ আইনে বলা আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি, হাসপাতাল প্রভৃতি স্থাপনা থেকে ১ কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। অথচ স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, হাটবাজার মার্কেট ও গ্রামের ভেতর বসতবাড়ি ঘেরা কৃষি জমিতে ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, প্রতিটি ইটভাটায় দেড়শ থেকে তিন শতাধিক নানা বয়সের শ্রমিক কাজ করছে। অধিকাংশ শ্রমিকের দিন কাটছে মানবেতরভাবে। অনেক শিশুকিশোর ভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। এতে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে তারা। দেবীদ্বার উপজেলার কাবিলপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আবাসিক এলাকায় বাড়িঘর লাগোয়া একটি ইটের ভাটা। এ ভাটার কারণে চরম দুর্ভোগে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা জানান, এই ইটভাটা স্থানান্তরের দাবি জানালেও কেউ কর্ণপাত করছে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ইটখোলাগুলো থেকে নির্গত দূষিত উপাদানের প্রাদুর্ভাবে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এসব দূষিত উপাদানের মধ্যে পার্টিকুলেট ম্যাটার, কার্বন মনোঅক্সাইড, সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে। এটা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির বড় কারণ।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা শাখার সভাপতি ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, জেলায় অপরিকল্পিতভাবে অবৈধ ইটভাটা বহু বছর ধরে চলছে, যেন দেখার কেউ নেই। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কুমিল্লার উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘জেলায় গত এক বছরে মোট আবাদি জমি কমেছে ৮২৪ হেক্টর। এছাড়া ইটভাটার মাটির জোগান দিতে জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়ায় অনাবাদি হচ্ছে অনেক জমি।’

পরিবেশ অধিদফতর, কুমিল্লার উপপরিচালক শওকত আরা কলি বলেন, ‘অনুমোদন বা ছাড়পত্র না নিয়ে কিংবা নবায়ন না করে কেউ ইটভাটা পরিচালনা করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চলতি বছর চারটি ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছি। তবে শিশুশ্রমের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের।’ এ অধিদফতরের কুমিল্লার উপ-মহাপরিদর্শক প্রকৌশলী এম এম মামুন অর-রশিদ বলেন, ‘ইটভাটা বা কলকারখানা পরিদর্শন করে শিশুশ্রমিক পাওয়া গেলে আমরা আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকি।’

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন এলাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কিছু ইটভাটা ধ্বংস করা সহ অনেককে জরিমানা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

সূত্রঃ ইত্তেফাক

     আরো পড়ুন....

পুরাতন খবরঃ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  

ফেসবুকে আমরাঃ